ঢাকার আলো, লন্ডনের কুয়াশা, মস্কোর শীত
(A Novel of Love, Distance, and Return)
প্রাককথন
(A Novel of Love, Distance, and Return)
মানুষের জীবন কখনও সরল রেখায় চলে না।
এটি চলে বাঁক নিয়ে, ভাঙন পেরিয়ে, হারিয়ে গিয়ে, আবার ফিরে এসে। প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে—যেগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে না, বরং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। এই উপন্যাস ঠিক তেমনই একটি সম্পর্কের গল্প।
“ঢাকার আলো, লন্ডনের কুয়াশা, মস্কোর শীত” একটি প্রেমের উপন্যাস হলেও, এটি কেবল প্রেমের গল্প নয়। এটি সময়ের গল্প, দূরত্বের গল্প, আত্মঅনুসন্ধানের গল্প এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—নিজেকে ফিরে পাওয়ার গল্প।
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সিন্দাবাদ ও রুহি দুই ভিন্ন মানসিকতার প্রতিনিধি। একজন বাস্তববাদী পর্যবেক্ষক, অন্যজন স্বপ্নবাজ নির্মাতা। তারা ভালোবাসে, কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎও ভালোবাসে। এই দ্বন্দ্বই তাদের সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি।
এই কাহিনিতে ঢাকা, লন্ডন ও মস্কো কেবল শহর নয়—তারা তিনটি ভিন্ন জীবনপর্যায়, তিনটি ভিন্ন মানসিক অবস্থার প্রতীক।
ঢাকা এখানে শুরুর শহর—আবেগ, উচ্ছ্বাস ও প্রথম প্রেমের ঠিকানা।
লন্ডন হলো সংগ্রামের শহর—স্বপ্নের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্র।
মস্কো হলো নিঃসঙ্গতার শহর—নিজের সাথে মুখোমুখি হওয়ার স্থান।
এই তিন শহরের মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলো যেমন ভৌগোলিকভাবে ভ্রমণ করে, তেমনি মানসিকভাবেও পরিণত হয়।
এই উপন্যাসের উদ্দেশ্য
এই বই লেখার মূল উদ্দেশ্য কোনো আদর্শিক প্রেমকাহিনি নির্মাণ নয়। বরং আধুনিক জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরা—যেখানে ভালোবাসা ও ক্যারিয়ার, আবেগ ও দায়িত্ব, স্বপ্ন ও সম্পর্ক একে অপরের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়।
আজকের বিশ্বে সম্পর্ক আর সীমাবদ্ধ নয় একটি শহরে বা একটি দেশে। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনেছে, আবার দূরেও সরিয়েছে। ভিডিও কল, টাইম জোন, ব্যস্ততা—এইসবের ভেতর দিয়ে ভালোবাসা টিকে থাকার লড়াই চালায়।
এই উপন্যাস সেই লড়াইয়ের গল্প।
নারী চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
রুহি চরিত্রটি সচেতনভাবে নির্মিত হয়েছে একজন স্বাধীন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, আধুনিক দক্ষিণ এশীয় নারীর প্রতিচ্ছবি হিসেবে। সে প্রেমকে অস্বীকার করে না, কিন্তু নিজের স্বপ্নকেও বিসর্জন দেয় না।
এই উপন্যাসে নারী চরিত্রকে ত্যাগের প্রতিমা হিসেবে নয়, বরং সিদ্ধান্তগ্রহণকারী একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ভাঙন ও পুনর্গঠনের দর্শন
এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধুমাত্র বিচ্ছেদের কাহিনি নয়। এটি পুনর্গঠনের কাহিনি।
ভাঙার পর কীভাবে মানুষ আবার দাঁড়ায়,
কীভাবে নিজের ক্ষতকে শক্তিতে পরিণত করে,
কীভাবে নিজেকে ক্ষমা করতে শেখে—
এই বিষয়গুলোই উপন্যাসের আত্মা।
সিন্দাবাদের যাত্রা পাঠককে শেখায়—ভাঙা মানেই শেষ নয়। অনেক সময় ভাঙনই নতুন জীবনের দরজা খুলে দেয়।
পাঠকের প্রতি আহ্বান
এই বই পাঠ করার সময় পাঠককে অনুরোধ করা হচ্ছে—এটি শুধু গল্প হিসেবে না পড়ে, নিজের জীবনের আয়না হিসেবে পড়তে।
প্রতিটি অধ্যায়ে হয়তো পাঠক নিজের কোনো অভিজ্ঞতা, কোনো স্মৃতি, কোনো না-বলা কষ্ট খুঁজে পাবেন।
এই বই সেইসব মানুষের জন্য—
যারা দূরত্বে থেকেও ভালোবেসেছে,
অপেক্ষা করেছে,
ভেঙেছে,
আবার উঠেছে।
কৃতজ্ঞতা
এই উপন্যাস লেখার পথে অসংখ্য পাঠক, চিন্তাশীল মানুষ ও জীবনের অভিজ্ঞতা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা সেইসব মানুষের প্রতি, যারা জীবনের কঠিন সময়ে হাল ছাড়েননি—কারণ এই বই মূলত তাঁদের গল্প।
শেষ কথা
“ঢাকার আলো, লন্ডনের কুয়াশা, মস্কোর শীত” নিখুঁত প্রেমের গল্প নয়।
এটি বাস্তব মানুষের গল্প।
এখানে মানুষ ভুল করে, শেখে, হারায়, আবার খুঁজে পায়।
এখানে ভালোবাসা কখনও ব্যর্থ হয়,
কিন্তু মানুষ ব্যর্থ হয় না।
যদি এই উপন্যাস পাঠকের হৃদয়ে একটুকু আলো জ্বালাতে পারে, একটি প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, অথবা কাউকে নিজের ভাঙা অংশগুলো নিয়ে এগোতে সাহস দেয়—তবেই এই লেখা সার্থক।
—
লেখক
🌿 অধ্যায় এক
সংসদের ছায়ায় প্রথম দেখা
ঢাকা শহর দুপুরে অন্যরকম হয়ে ওঠে।
রোদের তাপে রাস্তা গলে যেতে চায়, বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, আর মানুষের মুখে জমে থাকে অদ্ভুত এক ক্লান্তি। কিন্তু সংসদ ভবন এলাকার বাতাসে সবসময়ই একটু আলাদা সৌন্দর্য থাকে। এখানে আলো নরম, ছায়া গভীর, আর সময় যেন ধীরে চলে।
সেই দিনটাও ছিল তেমনই।
সিন্দাবাদ তখন তার ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ছিল। একটি রিপোর্টের জন্য ছবি তুলছিল—“ঢাকার সবুজ অঞ্চল ও নগরায়ণ”।
কাজে মন ছিল না।
গত কয়েক মাস ধরে তার ভিতরে অদ্ভুত এক শূন্যতা কাজ করছিল। পেশাগতভাবে সে সফল, পরিচিত মুখ, টিভিতে আসে, পত্রিকায় লেখে—তবু কোথাও যেন কিছু নেই।
ঠিক তখনই সে তাকে দেখল।
মেয়েটি দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে। হাতে ক্যামেরা। সূর্যের আলো তার চুলে পড়ে ঝিলমিল করছিল। সাদা কুর্তি, নীল ওড়না, চোখে গভীর মনোযোগ।
সে কিছু একটা ফ্রেম করছে।
সিন্দাবাদ তাকিয়ে রইল।
নিজেও বুঝতে পারল না কেন।
কয়েক সেকেন্ড পরে মেয়েটি ঘুরে তাকাল।
চোখে চোখ পড়ল।
এক মুহূর্ত।
নীরব।
তারপর মেয়েটি হালকা হেসে বলল—
“আপনিও ছবি তুলছেন?”
সিন্দাবাদ একটু থমকে গিয়ে বলল—
“হ্যাঁ… মানে… চেষ্টা করছি।”
মেয়েটি কাছে এগিয়ে এল।
“আলোটা এখান থেকে ভালো পড়ছে,” সে বলল, আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখিয়ে।
সিন্দাবাদ তাকাল।
সত্যিই।
“আপনি ফটোগ্রাফার?” সে জিজ্ঞেস করল।
“ডকুমেন্টারি বানাই,” মেয়েটি বলল।
“নাম রুহি।”
“আমি সিন্দাবাদ।”
নাম দুটো বাতাসে ভেসে রইল।
রুহি আবার ক্যামেরা তুলল।
“ঢাকাকে আপনি কেমন দেখেন?” সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
সিন্দাবাদ অবাক হল।
“মানে?”
“শহরটা আপনাকে কী দেয়?”
সে একটু ভেবে বলল—
“ক্লান্তি… আর গল্প।”
রুহি হেসে বলল—
“আমার কাছে ঢাকা দেয় আলো।”
সেই মুহূর্তেই সিন্দাবাদ বুঝল—এই মেয়েটা সাধারণ কেউ না।
প্রথম হাঁটা
কাজ শেষ হওয়ার পর তারা একসাথে হাঁটতে লাগল।
সংসদ ভবনের পাশ দিয়ে।
গাছের ছায়ায়।
রুহি বলল—
“আপনি খুব চুপচাপ।”
“আমি কথা কম বলি,” সিন্দাবাদ বলল।
“আপনি বেশি বলেন।”
“কারণ আমি জীবন জমাতে চাই,” রুহি বলল।
“কীভাবে?”
“কথায়। স্মৃতিতে। ছবিতে।”
সিন্দাবাদ তাকিয়ে রইল।
সে বুঝল—এই মেয়েটা শুধু বাঁচে না, জীবনকে ধরে রাখে।
বিদায়ের আগে
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা।
রুহি বলল—
“আমাকে যেতে হবে।”
“আবার দেখা হবে?” সিন্দাবাদ জিজ্ঞেস করল।
রুহি একটু থেমে বলল—
“ঢাকা ছোট শহর। আবার দেখা হবেই।”
তারপর চলে গেল।
সিন্দাবাদ দাঁড়িয়ে রইল।
হাতে ক্যামেরা।
কিন্তু মন ভরা।
সে জানত না—এই ছোট্ট দেখা তার জীবনের মানচিত্র বদলে দেবে।
🌿 অধ্যায় দুই
বলদা গার্ডেন ও গুলশান লেক
সিন্দাবাদ বুঝতেই পারেনি—একটি বিকেলের ছোট্ট আলাপ কীভাবে তার মাথার ভিতর জায়গা করে নিল।
পরের কয়েকদিন সে বারবার সংসদ ভবন এলাকায় গিয়েছিল। অজুহাত ছিল কাজ, কিন্তু আসল কারণ ছিল রুহি। সে জানত না আবার দেখা হবে কি না, তবু প্রতিদিন একটু আশায় দাঁড়িয়ে থাকত।
চতুর্থ দিন, বিকেলের দিকে, সে তাকে আবার দেখল।
রুহি তখন বলদা গার্ডেনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। সাদা টপ, কালো ব্যাগ, চোখে সানগ্লাস।
সিন্দাবাদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে সাহস করে এগিয়ে গেল।
“রুহি?”
রুহি ঘুরে তাকাল। চোখে বিস্ময়।
“আপনি!”
“আমি… এখানে কাজ ছিল।”
“আবার?” রুহি মুচকি হাসল।
সিন্দাবাদ বুঝল—সে ধরা পড়ে গেছে।
“ভিতরে যাবেন?” রুহি জিজ্ঞেস করল।
“চলুন।”
সবুজের ভিতর কথা
বলদা গার্ডেনের ভিতরে ঢুকতেই শহরের শব্দ কমে গেল।
পাতার ফাঁক দিয়ে আলো নামছে। পাখিরা ডাকছে। বাতাসে মাটির গন্ধ।
রুহি ক্যামেরা তুলল।
“এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়,” সে বলল।
“কেন?”
“এখানে এসে মনে হয়, ঢাকা একটু থামে।”
সিন্দাবাদ বলল—
“আপনি থামেন?”
রুহি মাথা নেড়ে বলল—
“না। আমি দৌড়াই।”
“কোথায়?”
“স্বপ্নের দিকে।”
এই কথাটা সিন্দাবাদের বুকের ভিতর কেঁপে উঠল।
তারা একটা বেঞ্চে বসলো।
রুহি বলল—
“আপনি কেন সাংবাদিক হলেন?”
“কারণ আমি মানুষ বুঝতে চাই।”
“পেরেছেন?”
“এখনও চেষ্টা করছি।”
রুহি হেসে বলল—
“তাহলে আমাকেও বুঝতে হবে।”
গুলশান লেকের সন্ধ্যা
সেদিন বিকেলে তারা গেল গুলশান লেকে।
আকাশ তখন লালচে। পানিতে আলো ভাসছে।
রুহি হাঁটছিল ধীরে।
“আপনি কি সবসময় এমন নীরব?” সে জিজ্ঞেস করল।
“না,” সিন্দাবাদ বলল, “কিছু মানুষের সামনে নীরব থাকি।”
“আমি কোন দলে?”
“বিশেষ দলে।”
রুহি তাকাল।
“মানে?”
“আপনি কথা না বললেও, ভালো লাগে।”
রুহি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
“আপনি বিপজ্জনক।”
“কেন?”
“এভাবে কথা বললে মানুষ জড়িয়ে পড়ে।”
সিন্দাবাদ হালকা হেসে বলল—
“তাহলে সাবধানে থাকবেন।”
প্রথম উপলব্ধি
লেকের ধারে বসে রুহি হঠাৎ বলল—
“আপনি জানেন, আমি লন্ডনে পড়তে যেতে চাই।”
সিন্দাবাদ থমকে গেল।
“কবে?”
“এখনও ঠিক না। প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
“তাহলে…”
“তাহলে কী?”
সে বলতে পারল না—
“তাহলে আমি কী হব?”
রুহি বলল—
“আপনি আমার ঢাকার গল্প হবেন।”
সিন্দাবাদ বুঝল—সে এই গল্পের অংশ হতে চাইছে।
বিদায়ের মুহূর্ত
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।
রুহি বলল—
“আজ অনেক কথা বললাম।”
“আমি কম বলেছি,” সিন্দাবাদ বলল।
“কিন্তু চোখে অনেক কথা ছিল।”
তারা বিদায় নিল।
রিকশায় উঠে রুহি হাত নেড়ে দিল।
সিন্দাবাদ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো—এই শহরটা আজ একটু বদলে গেছে।
কারণ রুহি এসেছে।
🌙 অধ্যায় তিন
তুরাগের জোছনায় নৌকা
ঢাকায় কিছু রাত থাকে—যেগুলো দিনের মতো মনে হয় না।
সেগুলো যেন আলাদা পৃথিবী, আলাদা বাতাস, আলাদা সময়। শহরের কোলাহল কমে আসে, রাস্তাগুলো একটু নিঃশ্বাস নেয়, আর মানুষের মন—যা সারাদিন গরম হয়ে থাকে—হঠাৎ ঠান্ডা হতে শেখে।
সিন্দাবাদের জন্য সেই রাতটা ছিল তেমনই।
রুহি সেদিন রাতে হঠাৎ ফোন করেছিল। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
“আপনি কী করছেন?” রুহির গলা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু দ্রুত, যেন ভেতরে উত্তেজনা আছে।
“কাজ,” সিন্দাবাদ বলল, “তবে কাজটা এখন আর মাথায় নেই।”
রুহি হেসে ফেলল।
“তাহলে বের হন। এখনই।”
“এখন?”
“হ্যাঁ। তুরাগে যাব।”
সিন্দাবাদ থমকে গেল।
“এত রাতে?”
“জোছনা উঠেছে,” রুহি বলল, যেন এটিই যথেষ্ট যুক্তি। “আর আপনি তো বলেছিলেন—ঢাকা শুধু ক্লান্তি আর গল্প দেয়। আজ গল্পটা আমি দেব।”
ফোন কেটে গেল।
সিন্দাবাদ জানালার বাইরে তাকাল। আকাশটা সত্যিই পরিষ্কার। জোছনার আলো কাঁচের ওপর নরম করে পড়েছে। তার মনে হলো—এই আহ্বানটা উপেক্ষা করা যাবে না।
শহর পেরিয়ে নদীর দিকে
রুহি গাড়িতে উঠতেই বলল,
“আপনি আসবেন ভাবিনি।”
“আপনি ডাকলেন,” সিন্দাবাদ বলল।
“ডাকে সবাই আসে না।”
“আমি আসি,” সে চুপচাপ বলল।
গাড়ি ছুটল।
ঢাকা রাতের বুকে অন্যরকম। রাস্তায় কম গাড়ি, কিন্তু থেমে নেই। কোন কোন মোড়ে চা-স্টল খোলা, কোথাও কুকুর ঘুমাচ্ছে, কোথাও পাহারাদার গেটের সামনে বসে বিড়ি ধরাচ্ছে।
রুহি জানালা একটু নামিয়ে দিল। ঠান্ডা বাতাস ঢুকল।
“আপনি কি সবসময় এমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেন?” সিন্দাবাদ জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ,” রুহি বলল, “কারণ আমি ভাবলে ভয় পাই।”
“কিসের ভয়?”
“যে আমি একা পড়ে যাব।”
সিন্দাবাদ কথাটা শুনে চুপ করে গেল। এটা কোনো সাধারণ কথা না। এটা এমন কথা, যা মানুষ হঠাৎ করে কাউকে বলে না—যদি না সেই কাউকে একটু বিশ্বাস করে।
মাঝির চোখ ও নদীর নীরবতা
তুরাগ নদীর ঘাটে পৌঁছাতে রাত প্রায় একটা।
ঘাটের পাশে কিছু নৌকা বাঁধা, বাতাসে নদীর কাঁচা গন্ধ, আর জোছনার আলো পানির ওপর কাঁপছে। চারপাশে কেবল দূরের গাড়ির শব্দ আর পানির ছলাৎছল।
একজন মাঝি চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে ছিল। রুহি এগিয়ে গিয়ে বলল,
“ভাই, নৌকা হবে?”
মাঝি চোখ ছোট করে তাকাল।
“রাত অনেক, আপা। নদীটা সহজ না।”
রুহি শান্ত গলায় বলল,
“আমরা নদীকে বিরক্ত করতে আসিনি। আমরা শুধু জোছনা দেখতে চাই।”
মাঝি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“ঠিক আছে। কিন্তু মাঝ নদীতে যাব না। ঘাটের দিকেই ঘোরাব।”
রুহি মাথা নেড়ে রাজি হলো।
সিন্দাবাদ দেখল—রুহি যখন কথা বলে, তার গলায় এক ধরনের দৃঢ়তা থাকে। সে ভয় পায় না। বা ভয় পেলেও দেখায় না।
নৌকায় ওঠা
নৌকায় ওঠার সময় রুহি একটু পিছলে গেল। সিন্দাবাদ দ্রুত তার হাত ধরল। রুহি হাত ছাড়াল না।
দুজন পাশাপাশি বসল। মাঝি দাঁড় টানল। নৌকা ধীরে ধীরে পানির বুকে এগিয়ে গেল।
জোছনার আলো নৌকার কাঠের ওপর পড়ে সাদা-সাদা হয়ে উঠছিল। পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি।
রুহি মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা আমার ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।”
সিন্দাবাদ বলল,
“ঢাকা সুন্দর হয়… যখন আপনি দেখান।”
রুহি চোখ ঘুরিয়ে তাকাল।
“আপনি আবার সেই কবিতার কথা বলছেন।”
“আমি কবি না,” সিন্দাবাদ বলল, “আপনি আমাকে কবি বানান।”
রুহি হেসে ফেলল। সেই হাসিটা নদীর জোছনার মতো—নরম, কিন্তু গভীর।
স্পর্শের প্রথম সাহস
নৌকা একটু দূরে এগোলো।
হঠাৎ বাতাস বাড়ল। রুহি শালটা গায়ে টানল। তার চুল উড়ে এসে গালের ওপর পড়ল। সে চুল সরাতে গিয়েও যেন থেমে গেল—কারণ সিন্দাবাদ তার চুলে মৃদু করে হাত বুলিয়ে দিল।
স্পর্শটা খুব হালকা।
যেন কেউ ভয় পাচ্ছে—চুল ভেঙে যাবে, বা সম্পর্ক ভেঙে যাবে।
রুহি চোখ বন্ধ করল।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনই চুপ।
শুধু নদীর শব্দ।
তারপর রুহি খুব নিচু স্বরে বলল,
“আপনি জানেন… আমি কখনও কাউকে এভাবে কাছে আসতে দিইনি।”
সিন্দাবাদ বলল,
“আমি জোর করি না।”
“তবু আপনি এলেন,” রুহি বলল।
“কারণ আপনি ডাকলেন।”
রুহি চোখ খুলল। জোছনার আলোয় তার চোখ ভিজে আছে কি না, সিন্দাবাদ বুঝতে পারল না। কিন্তু বুকের ভিতর তার এক ধরনের মৃদু কাঁপুনি অনুভব হলো।
কথা, যা বলা হয় না
রুহি হঠাৎ বলল,
“আপনি যদি আমাকে ভালোবাসেন—বলবেন?”
সিন্দাবাদ থমকে গেল।
এটা এমন প্রশ্ন, যা জোছনার মতো নরম, কিন্তু ভিতরে ঝড়।
সে বলল না। শুধু বলল,
“আমি আপনাকে হারাতে চাই না।”
রুহি হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ কম, বোঝা বেশি।
“হারানো তো একদিন হবেই,” সে বলল, “আমরা সবাই হারাই।”
সিন্দাবাদ বলল,
“সবাই না। কিছু মানুষ থেকে যায়।”
রুহি তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
“দেখা যাক—আপনি থাকেন কি না।”
ফেরার পথে
নৌকা ঘাটের দিকে ফিরল। মাঝি দাঁড় টানছিল, আর দূরে ঢাকার আলো দেখা যাচ্ছিল—ছোট ছোট বিন্দুর মতো।
রুহি বলল,
“আজকের রাতটা আমি ভুলব না।”
সিন্দাবাদ বলল,
“আমি তো এর ভেতরেই হারিয়ে গেলাম।”
ঘাটে নেমে রুহি থামল। সিন্দাবাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি কি আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন?”
“অবশ্যই।”
গাড়িতে ওঠার সময় রুহি আবার হাত ধরল—খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন এটা তাদের মাঝে বহুদিনের অভ্যাস।
সিন্দাবাদ জানত—এই হাত ধরা শুধু হাত ধরা নয়। এটা একটা চুক্তি।
বলা নেই, কিন্তু বোঝা যায়।
রাতের শেষে
রুহিকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে সিন্দাবাদ কিছুক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল। রুহি ভেতরে গিয়ে একবার পেছনে তাকাল, হাত নেড়ে বলল—
“ঘুমাবেন?”
সিন্দাবাদ বলল,
“আজ ঘুম আসবে না।”
রুহি হেসে দরজা বন্ধ করল।
সিন্দাবাদ গাড়িতে ফিরে বসলো।
ঢাকা তখনও জেগে।
কিন্তু তার ভিতরে অন্য এক শহর জেগে উঠেছে—রুহির শহর।
আর সে বুঝল, আজ থেকে তার গল্প আর শুধুই নিজের নয়।
✨ অধ্যায় চার
ঢাকা ক্লাব ও শেষ রাত (থার্টি ফার্স্ট নাইট)
ঢাকায় বছরের শেষ রাতটা কখনও সাধারণ হয় না।
৩১শে ডিসেম্বর মানেই আলো, গান, ভিড়, আতশবাজি, আর মানুষের ভেতরের অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস। যেন সবাই চায়—পুরোনো দুঃখ, ব্যর্থতা, না-পাওয়া—সব পেছনে ফেলে নতুন বছরে ঢুকতে।
সেই বছরও ব্যতিক্রম ছিল না।
সিন্দাবাদ ঢাকা ক্লাবের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
কালো ব্লেজার, সাদা শার্ট—আজ সে একটু আলাদা করে সাজিয়েছে নিজেকে। কারণ আজকের রাতটা তার কাছে শুধু উৎসব নয়, একটা সিদ্ধান্তের রাত।
রুহি আসবে।
ঠিক রাত আটটায়।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
“আমি ঢুকছি,” রুহির কণ্ঠে হালকা হাসি।
“আমি গেটেই আছি।”
কয়েক মিনিট পর সে তাকে দেখল।
কালো শাড়ি, রুপালি বর্ডার, খোলা চুল, কানে ছোট দুল।
রুহি আজ অন্যরকম লাগছিল।
আরও পরিণত।
আরও সুন্দর।
সিন্দাবাদ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল।
“এইভাবে তাকিয়ে থাকলে লোকজন ভাববে আপনি প্রেমে পড়েছেন,” রুহি বলল।
সিন্দাবাদ মুচকি হাসল।
“ভাবুক।”
রুহি একটু থমকে গেল।
তারপর হেসে বলল—
“চলুন।”
আলোর ভিড়, নীরব মন
ঢাকা ক্লাব ভরে গেছে মানুষের কোলাহলে।
লাইট, মিউজিক, হাসি, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ।
একদিকে ডান্স ফ্লোর, অন্যদিকে ডিনার এরিয়া, কোথাও কাউন্টডাউন স্ক্রিন।
সবাই ব্যস্ত—নিজের আনন্দ নিয়ে।
রুহি আর সিন্দাবাদ একটা টেবিলে বসল।
ওয়েটার এসে পানীয় দিল।
রুহি জুস নিল।
সিন্দাবাদ নিল এক গ্লাস ওয়াইন।
“আপনি আজ খুব চুপচাপ,” রুহি বলল।
“আমি ভাবছি,” সে বলল।
“কী নিয়ে?”
“আমাদের নিয়ে।”
রুহি গ্লাসে বরফ নাড়াল।
“ভয় পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কিসের?”
“যে আমি দেরি করে ফেলব।”
রুহি তাকাল।
“কিসে দেরি?”
সিন্দাবাদ উত্তর দিল না।
নাচের ফাঁকে কথোপকথন
মিউজিক জোরে উঠল।
কিছু বন্ধু এসে রুহিকে নাচের জন্য ডাকল।
“চলুন,” রুহি বলল।
সিন্দাবাদ প্রথমে না করল।
“আমি নাচতে পারি না।”
“কেউ পারেও না,” রুহি হেসে বলল, “তবু নাচে।”
সে সিন্দাবাদের হাত টেনে নিয়ে গেল।
ডান্স ফ্লোরে আলো ঘুরছে। চারপাশে মানুষ লাফাচ্ছে।
রুহি হাসছিল।
খোলা মনে।
সিন্দাবাদ তাকিয়ে দেখছিল।
সে বুঝল—এই মেয়েটার হাসিই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
একসময় মিউজিক থামল।
দুজন বাইরে এসে বসল।
রুহি হাঁপাচ্ছিল।
“মজা হলো,” সে বলল।
“তোমাকে দেখে,” সিন্দাবাদ বলল, “সবসময়ই হয়।”
রুহি এবার আর হাসল না।
চুপ করে তাকিয়ে থাকল।
বারোটার অপেক্ষা
ঘড়িতে তখন ১১:৫৫।
সবাই কাউন্টডাউনের জন্য প্রস্তুত।
বড় স্ক্রিনে সংখ্যা ভাসছে।
১০…
৯…
৮…
রুহি আর সিন্দাবাদ পাশাপাশি দাঁড়াল।
চারপাশে হৈচৈ।
৭…
৬…
৫…
রুহি ফিসফিস করে বলল—
“তুমি কিছু বলতে চাও, তাই না?”
৪…
৩…
সিন্দাবাদ গভীর নিশ্বাস নিল।
২…
“রুহি…”
১…
চারপাশে বিস্ফোরণ।
“হ্যাপি নিউ ইয়ার!”
আতশবাজি। চিৎকার। আলিঙ্গন।
সেই মুহূর্তে সিন্দাবাদ বলল—
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
শব্দটা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
কিন্তু রুহি শুনল।
সে তাকাল।
চোখ বড়।
তারপর ধীরে হাসল।
“এতদিন পরে?”
“হ্যাঁ,” সিন্দাবাদ বলল, “কারণ আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম।”
রুহি বলল—
“আমি তো অনেক আগেই জানতাম।”
“তবু বললে ভালো লাগল,” সে যোগ করল।
তারপর ধীরে বলল—
“আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”
রাতের শেষ কথা
রাত প্রায় শেষ।
মানুষ বাড়ি ফিরছে।
ঢাকা ক্লাব ফাঁকা হচ্ছে।
রুহি আর সিন্দাবাদ গেটের সামনে দাঁড়াল।
বাতাস ঠান্ডা।
আকাশে শেষ কয়েকটা আতশবাজি।
রুহি বলল—
“জানো, আজকের রাতটা আমার জীবনের সেরা রাত।”
সিন্দাবাদ বলল—
“আমারও।”
রুহি একটু থেমে বলল—
“কিন্তু একটা কথা আছে…”
“কী?”
“আমি সত্যিই লন্ডনে যেতে চাই।”
সিন্দাবাদের বুক কেঁপে উঠল।
“তুমি যাবে?”
“হ্যাঁ। কয়েক মাস পর।”
নীরবতা।
তারপর সিন্দাবাদ বলল—
“আমি অপেক্ষা করব।”
রুহি তাকাল।
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ। কারণ এবার আমি ভয় পাই না।”
রুহি তার কাঁধে মাথা রাখল।
“তাহলে আমরা লড়ব,” সে বলল।
রাত শেষে
রুহিকে নামিয়ে দিয়ে সিন্দাবাদ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকল।
ঢাকা তখন নতুন বছরে ঢুকেছে।
তার জীবনও।
নতুন স্বপ্ন নিয়ে।
নতুন ভয় নিয়ে।
নতুন ভালোবাসা নিয়ে।
সে বুঝল—এই প্রেম আর সহজ হবে না।
কিন্তু সত্যি হবে।
✈️ অধ্যায় পাঁচ
বিদায়ের বিমান
ঢাকায় বিদায়ের দিনগুলো কখনও হঠাৎ আসে না।
ওগুলো ধীরে ধীরে আসে—প্রথমে কথায়, তারপর পরিকল্পনায়, তারপর ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে, শেষে বাস্তবে।
রুহির লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্তও ঠিক তেমনভাবেই এগিয়েছিল।
প্রথমে ছিল শুধু একটা স্বপ্ন।
তারপর IELTS-এর প্রস্তুতি।
তারপর আবেদন।
তারপর অফার লেটার।
তারপর ভিসা।
আর শেষে—একটা নির্দিষ্ট তারিখ।
১৫ই আগস্ট।
রাত ৩:১০।
ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ।
সিন্দাবাদ সেই তারিখটা মোবাইলে সেভ করেছিল—
“Ruhi’s Flight”
শেষ সপ্তাহ
যাওয়ার আগের সপ্তাহটা তারা যেন ইচ্ছা করেই ধীরে কাটাল।
প্রতিদিন দেখা।
প্রতিদিন কোথাও না কোথাও যাওয়া।
একদিন ফ্রেঞ্চ বেকারিতে কফি।
একদিন বলদা গার্ডেনে হাঁটা।
একদিন বেইলি রোডে নাটক।
একদিন তুরাগের ধারে বসে চুপচাপ থাকা।
কথা কম।
চাহনি বেশি।
রুহি বলত—
“আমরা কি খুব নাটক করছি না?”
সিন্দাবাদ বলত—
“হয়তো। কিন্তু এই নাটকটাই আমার জীবন।”
এক সন্ধ্যায় রুহি হঠাৎ বলল—
“তুমি যদি চাও, আমি না-ও যেতে পারি।”
সিন্দাবাদ চমকে গেল।
“না,” সে বলল দৃঢ়ভাবে, “তুমি যাবে। স্বপ্ন ছেড়ে কাউকে ভালোবাসা যায় না।”
রুহি তাকিয়ে রইল।
“তুমি ভালো মানুষ,” সে বলল।
“আমি শুধু তোমাকে হারাতে চাই না,” সিন্দাবাদ উত্তর দিল।
বিদায়ের রাত
১৫ই আগস্ট।
রাত ১:৩০।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
সব আলো জ্বলছে।
কিন্তু সিন্দাবাদের মনে হচ্ছিল—সব নিভে যাচ্ছে।
রুহি হালকা নীল শাল গায়ে।
ছোট ট্রলি।
হাতে পাসপোর্ট।
সে আজ খুব শান্ত।
অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
চেক-ইনের লাইনে দাঁড়িয়ে রুহি বলল—
“আমার ভয় লাগছে না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি আছ।”
সিন্দাবাদ কিছু বলল না।
তার গলা আটকে আসছিল।
সব কাজ শেষ।
ইমিগ্রেশনের গেটের সামনে দাঁড়াল তারা।
এটাই শেষ লাইন।
এরপর আর একসাথে থাকা যাবে না।
রুহি প্রথমে কথা বলল।
“তুমি কাঁদবে না,” সে বলল।
“তুমিও না,” সিন্দাবাদ বলল।
রুহি হাসল।
কিন্তু চোখ ভিজে।
“আমি ফিরে আসব,” সে বলল।
“আমি অপেক্ষা করব,” সে উত্তর দিল।
রুহি তাকে জড়িয়ে ধরল।
খুব শক্ত করে।
যেন ছয় মাস, এক বছর, সব একসাথে ধরে রাখছে।
“ভালো থেকো,” সে ফিসফিস করে বলল।
“তুমিও।”
তারপর সে পেছনে না তাকিয়েই হাঁটতে লাগল।
সিন্দাবাদ তাকিয়ে থাকল।
যতক্ষণ না নীল শালটা ভিড়ে হারিয়ে গেল।
প্রথম শূন্যতা
বাড়ি ফেরার সময় ঢাকাটা তাকে আজ অচেনা লাগল।
রাস্তা একই।
লাইট একই।
মানুষ একই।
তবু সব ফাঁকা।
রুহির বাসার সামনে দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে সে থামল।
উপরের ফ্ল্যাটে আলো নিভে।
সে জানত—এখন এই আলো আর জ্বলবে না।
সে ফোন বের করল।
মেসেজ এল—
“বোর্ডিং শুরু হয়েছে ❤️”
সে লিখল—
“আমি এখানেই আছি।”
প্রথম ভিডিও কল
পরদিন সকাল।
লন্ডন সময় ভোর।
ঢাকা সময় দুপুর।
রুহির ভিডিও কল এল।
পেছনে হোস্টেল রুম।
জানালায় কুয়াশা।
“দেখো,” সে বলল, “আমি পৌঁছে গেছি।”
সিন্দাবাদ তাকিয়ে দেখল।
রুহির চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে উত্তেজনা।
“ভালো লাগছে?”
“ভয় আর ভালো লাগা একসাথে,” সে বলল।
“আমি মিস করছি,” সিন্দাবাদ বলল।
“আমিও,” রুহি বলল।
দূরত্বের শুরু
প্রথম মাস ভালোই কাটল।
প্রতিদিন কল।
প্রতিদিন ছবি।
প্রতিদিন ‘মিস ইউ’।
কিন্তু সময় বদলায়।
রুহির ক্লাস বাড়ল।
প্রজেক্ট বাড়ল।
নতুন বন্ধু এলো।
সিন্দাবাদের কাজ বেড়ে গেল।
কথা কমতে লাগল।
একদিন কল মিস হলো।
তারপর দুইদিন।
তারপর এক সপ্তাহ।
রুহি মেসেজ দিল—
“Sorry, too busy.”
সিন্দাবাদ রিপ্লাই করল—
“Miss you.”
রুহি দেখল।
রিপ্লাই দিল না।
দূরে যাওয়ার প্রথম ইঙ্গিত
এক রাতে সিন্দাবাদ বলল—
“তুমি বদলে যাচ্ছ।”
রুহি ক্লান্ত গলায় বলল—
“আমি বড় হচ্ছি।”
এই দুই শব্দের মাঝখানে অনেক দূরত্ব ছিল।
🌫️ অধ্যায় ছয়
লন্ডনের কুয়াশায় রুহি
লন্ডন শহরটা রুহিকে প্রথম দিন থেকেই একটু ভীত করেছিল।
এই শহরে আকাশ যেন সবসময় চিন্তায় থাকে—কখনও ধূসর, কখনও সাদা, কখনও কুয়াশায় ঢাকা। সূর্য এখানে খুব কমই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঢাকার মতো উজ্জ্বল আলো নেই, নেই হঠাৎ বৃষ্টি, নেই কাকের ডাক।
এখানে শব্দও আলাদা।
ট্রেনের গম্ভীর গর্জন, পাতাল রেলের ঝাঁকুনি, রাস্তার ওপারে বাসের ধীর গতি—সব মিলিয়ে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত কোলাহল।
রুহি প্রথম সপ্তাহেই বুঝে গিয়েছিল—লন্ডন সুন্দর, কিন্তু সহজ নয়।
নতুন ঘর, নতুন একাকীত্ব
সে থাকত সাউথ কেনসিংটনের কাছাকাছি এক ছোট্ট হোস্টেলে।
ঘরটা ছোট।
একটা সিঙ্গেল বেড।
একটা ডেস্ক।
একটা জানালা।
জানালার বাইরে সারি সারি ইটের বাড়ি।
রাত হলে আলো নিভে যায়।
ঢাকার মতো ছাদে উঠে বাতাস খাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম রাতে রুহি ঘুমোতে পারেনি।
মোবাইলে সিন্দাবাদের পুরোনো মেসেজ পড়ছিল।
“ভালো থেকো।”
“মিস ইউ।”
“আজ তুরাগের জোছনা উঠেছে।”
সে হালকা হেসেছিল।
তারপর কেঁদেছিল।
এল এস ই-র জীবন
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে প্রথম দিন।
বড় বড় বিল্ডিং।
ছাত্রছাত্রী নানা দেশের।
বিভিন্ন ভাষার গুঞ্জন।
ক্লাসে বসে রুহি মনে করছিল—সে এখানে কতদূর থেকে এসেছে।
প্রফেসর কথা বলছেন—গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট, মিডিয়া এথিক্স, রিসার্চ মেথড।
রুহি মন দিয়ে শুনছিল।
নোট নিচ্ছিল।
সে জানত—এই সুযোগ সে হারাতে পারবে না।
ক্লাস শেষে এক মেয়ে এসে কথা বলল।
“Hi, I’m Emma.”
“I’m Ruhi. From Bangladesh.”
এমা হেসে বলল—
“That’s far!”
রুহি বলল—
“Not in memories.”
কুয়াশার মধ্যে হাঁটা
প্রায়ই সে একা একা হাঁটত টেমসের ধারে।
হুডি মাথায়।
হাতে কফি।
পানির ওপর ধোঁয়ার মতো কুয়াশা।
হাওয়ায় ঠান্ডা।
সে ফোনে সিন্দাবাদকে ছবি পাঠাত।
Caption:
“Cold here.”
সিন্দাবাদ লিখত—
“Warm in my heart.”
রুহি হেসে ফেলত।
কিন্তু হাসিটা ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যাচ্ছিল।
ব্যস্ততার বেড়াজাল
দ্বিতীয় মাস থেকে পড়াশোনার চাপ বেড়ে গেল।
রিসার্চ।
গ্রুপ ওয়ার্ক।
প্রেজেন্টেশন।
রাত তিনটা পর্যন্ত জাগা।
কফি।
নুডলস।
ল্যাপটপ।
সিন্দাবাদ তখন ফোন করত।
রুহি ধরত না।
পরে মেসেজ দিত—
“Sorry, deadline.”
প্রথম দিকে সিন্দাবাদ বুঝত।
পরে সে চুপচাপ হতে লাগল।
নতুন মানুষ, নতুন দূরত্ব
ক্লাসের এক ছেলে—ড্যানিয়েল।
ব্রিটিশ-বাংলাদেশি।
সবসময় সাহায্য করত।
নোট দিত।
লাইব্রেরিতে বসত।
কফি আনত।
রুহি প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝল—ড্যানিয়েল তাকে বুঝতে চেষ্টা করছে।
একদিন সে বলল—
“You miss home a lot.”
রুহি উত্তর দিল—
“Yes.”
“Someone there?”
“Yes.”
ড্যানিয়েল আর কিছু বলেনি।
কিন্তু তার চোখে ছিল প্রশ্ন।
রাতের নিঃসঙ্গতা
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল।
জানালায় টুপটাপ শব্দ।
রুহি বিছানায় বসে ছিল।
হঠাৎ সিন্দাবাদের ফোন।
সে ধরল।
“তুমি কেমন?”
“ভালো,” রুহি বলল।
মিথ্যে।
“শোন, আমি আজ খুব মিস করছি।”
রুহি চোখ বন্ধ করল।
“আমিও,” সে বলল।
আবার মিথ্যে।
কিন্তু এই মিথ্যেগুলোই তখন তাদের সম্পর্ক বাঁচিয়ে রেখেছিল।
নিজের সাথে যুদ্ধ
রুহি বুঝতে পারছিল—সে বদলে যাচ্ছে।
আগে যে মেয়েটা সহজে হাসত, এখন সে বেশি ভাবছে।
আগে যে মেয়েটা প্রেমে ভরসা রাখত, এখন সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তা করছে।
একদিন ডায়েরিতে লিখল—
“আমি কি স্বপ্নের জন্য ভালোবাসা হারাচ্ছি?”
উত্তর পেল না।
প্রথম বড় সিদ্ধান্ত
সেমিস্টারের শেষে রুহি বড় একটা প্রজেক্টের সুযোগ পেল।
ইউরোপিয়ান মিডিয়া নেটওয়ার্কের সাথে ইন্টার্নশিপ।
ছয় মাস।
প্যারিস ও বার্লিনে কাজ।
সে জানত—এই সুযোগ জীবন বদলে দেবে।
কিন্তু সিন্দাবাদ?
সে ফোন করল।
“আমাকে একটা অফার দিয়েছে,” সে বলল।
“কোথায়?”
“ইউরোপে। ছয় মাস।”
“আর আমি?”
রুহি চুপ।
এই নীরবতাই উত্তর।
অধ্যায়ের শেষ
রুহি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কুয়াশার দিকে তাকাল।
লন্ডন তাকে শক্ত করছে।
কিন্তু ঢাকার মেয়েটাকে ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে।
সে ফিসফিস করে বলল—
“সিন্দাবাদ, আমি তোমাকে হারাতে চাই না…”
কিন্তু কুয়াশা তার কথা শুনল না।
❄️ অধ্যায় আট
মস্কোর বরফে সিন্দাবাদ
মস্কো শহরটা প্রথম দেখাতেই সিন্দাবাদকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—
এই শহরে আবেগের জায়গা কম,
শৃঙ্খলার জায়গা বেশি।
প্লেন নামার সময় জানালা দিয়ে তাকিয়ে সে দেখেছিল—সব সাদা।
বরফ।
ছাদ।
রাস্তা।
গাছ।
ঢাকার সবুজ, লন্ডনের কুয়াশা—সব যেন অন্য জীবনের স্মৃতি।
এখানে জীবন কঠিন।
নতুন অফিস, নতুন নিয়ম
প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারসের মস্কো অফিস ছিল বিশাল।
কাঁচের দেয়াল।
স্টিলের ডেস্ক।
নীরব করিডোর।
মানুষ কম কথা বলে।
কাজ বেশি করে।
প্রথম দিন বস তাকে বলেছিল—
“Here, we work. No drama.”
সিন্দাবাদ বুঝেছিল—এই জায়গায় হৃদয় নয়, মাথা লাগে।
শীতের সাথে যুদ্ধ
মস্কোর শীত ছিল নির্মম।
মাইনাস পনেরো।
মাইনাস বিশ।
নিশ্বাস নিলে বুকে আগুন লাগে।
রাস্তায় হাঁটলে কান ব্যথা করে।
সিন্দাবাদ প্রথম সপ্তাহেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
হোস্টেলে একা বসে কম্বল জড়িয়ে কাঁপছিল।
তখন রুহিকে কল করেছিল।
“আমি খুব ঠান্ডা,” সে বলেছিল।
“কেন গেছো?” রুহি হালকা রাগে বলেছিল।
“কারণ ভবিষ্যৎ,” সে উত্তর দিয়েছিল।
ভবিষ্যৎ—একটা শব্দ, যা তাদের দূরে ঠেলে দিচ্ছিল।
একা দুপুর
অফিসের ক্যান্টিনে সবাই দল বেঁধে বসে।
রুশ ভাষার হাসি।
কঠিন উচ্চারণ।
সিন্দাবাদ একা বসে স্যুপ খেত।
মোবাইলে রুহির পুরোনো ছবি দেখত।
ঢাকার হাসি।
তুরাগের জোছনা।
গুলশান লেক।
সব এখন দূরের গ্রহ।
রুশ সন্ধ্যা
শুক্রবার রাতে সহকর্মীরা তাকে নিয়ে যেত বারে।
নিয়ন আলো।
জোর মিউজিক।
ভদকার গ্লাস।
“Drink!” তারা বলত।
সিন্দাবাদ প্রথমে না করত।
পরে অভ্যস্ত হয়ে গেল।
এক গ্লাস।
দুই গ্লাস।
তারপর মাথা হালকা।
হৃদয় ভারী।
একবার এক রুশ সহকর্মী, আনাস্তাসিয়া, বলেছিল—
“You always look sad.”
সিন্দাবাদ হেসেছিল।
“Professional sadness.”
সে জানত—এটা মিথ্যে।
সম্পর্কের দূরত্ব
মস্কো যাওয়ার পর কল আরও কমে গেল।
টাইম জোন।
কাজের চাপ।
রুহি ব্যস্ত।
সিন্দাবাদ ক্লান্ত।
কথা এখন শুধু—
“Busy?”
“Yes.”
“Ok.”
একদিন রুহি বলল—
“আমরা কি ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যাচ্ছি?”
সিন্দাবাদ উত্তর দেয়নি।
কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকলেও বলা যায় না।
মিনাবাজারের স্মৃতি
একদিন সে রুশ সুপারমার্কেটে ঢুকেছিল।
সব অচেনা পণ্য।
হঠাৎ এক কোণে “Halal” লেখা।
ভেতরে ঢুকে সে অবাক।
নান রুটি।
মসলা।
বাসমতি চাল।
মিনাবাজারের কথা মনে পড়ল।
রুহি বলত—
“এই চিজটা নিও।”
সে একা দাঁড়িয়ে হাসল।
তারপর চোখ ভিজল।
ভদকার গ্লাসে রুহি
এক শীতের রাতে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বাইরে তুষার পড়ছে।
হাতে ভদকার গ্লাস।
এক চুমুক।
রুহির মুখ।
আরেক চুমুক।
তুরাগ।
আরেক চুমুক।
ঢাকা।
শেষে গ্লাস খালি।
মনে শুধু শূন্যতা।
প্রথম বড় ভাঙন
একদিন সে ফোন করেছিল।
রুহি ধরেনি।
বারবার।
পাঁচবার।
শেষে মেসেজ—
“Call you later.”
সেই ‘later’ আর আসেনি।
রাতে রুহি লিখল—
“I’m confused, Sinbad.”
এই লাইনটা তার বুক ভেঙে দিয়েছিল।
নিজের সাথে কথা
সিন্দাবাদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
“তুই কী চাস?”
কোনো উত্তর এলো না।
সে বুঝল—সে সফল হচ্ছে।
কিন্তু সুখী হচ্ছে না।
অধ্যায়ের শেষ
মস্কোর বরফে দাঁড়িয়ে সিন্দাবাদ ভাবল—
কিছু মানুষ দূরে গেলে ঠান্ডা লাগে।
কিছু মানুষ দূরে গেলে বরফ জমে যায়।
তার ভিতরে বরফ জমছিল।
রুহির নামে।
ঢাকার নামে।
ভালোবাসার নামে।
💔 অধ্যায় দশ
না-বলা অভিযোগ
কিছু কষ্ট থাকে, যেগুলো মানুষ শব্দে প্রকাশ করে না।
সেগুলো জমতে থাকে—
নীরবতায়,
অপেক্ষায়,
ভুল বোঝাবুঝিতে,
অবহেলায়।
সিন্দাবাদ আর রুহির জীবনে তখন ঠিক তেমনই কষ্ট জমে উঠছিল।
দূরত্বের দেয়াল
নীরব ফোনকলের রাতের পর তাদের কথোপকথন আরও কমে গেল।
আগে যেখানে প্রতিদিন “গুড মর্নিং” ছিল,
এখন সেখানে সপ্তাহে একবার “হাই”।
আগে যেখানে দীর্ঘ কথা,
এখন সেখানে সংক্ষিপ্ত রিপ্লাই।
“Busy.”
“Later.”
“Ok.”
এই তিনটা শব্দেই তাদের সম্পর্ক আটকে গেল।
রুহির জমে থাকা কথা
লন্ডনে রুহি প্রতিদিন ক্লাস, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ নিয়ে দৌড়াচ্ছিল।
চারপাশে সবাই এগিয়ে যাচ্ছে।
কেউ পিএইচডি করছে।
কেউ বড় মিডিয়া হাউসে ঢুকছে।
কেউ ইউরোপে সেটেল হচ্ছে।
রুহি নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবত—
“আমি কি শুধু প্রেমে আটকে থাকব?”
সে সিন্দাবাদকে বলতে চাইত—
“তুমি বুঝো না, আমার স্বপ্ন কত বড়।”
কিন্তু বলেনি।
কারণ সে ভয় পেত—সিন্দাবাদ কষ্ট পাবে।
সিন্দাবাদের জমে থাকা কথা
মস্কোতে সিন্দাবাদ রাতের পর রাত একা কাটাত।
অফিস, বাসা, বার।
এই তিন জায়গার বাইরে তার জীবন ছিল না।
সে ভাবত—
“আমি কি শুধু টাকা আর কাজের মেশিন হয়ে গেলাম?”
সে রুহিকে বলতে চাইত—
“আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারি না।”
কিন্তু বলেনি।
কারণ সে ভয় পেত—দুর্বল দেখাবে।
সন্দেহের বিষ
একদিন সিন্দাবাদ আবার ফেসবুকে রুহির ছবি দেখল।
ড্যানিয়েলের সাথে, এক পার্টিতে।
হাসছে।
খুব খুশি।
সে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
“ও আমার সাথে এমন হাসে না এখন।”
সে মেসেজ করল—
“তুমি কি ওর সাথে বেশি সময় কাটাও?”
রুহি কয়েক ঘণ্টা পরে রিপ্লাই দিল—
“Again?”
এক শব্দেই বিরক্তি।
ঝগড়ার শুরু
সেদিন রাতে ভিডিও কল হলো।
দুজনই ক্লান্ত।
কিন্তু ভিতরে জমে থাকা কথা বের হতে চাইছিল।
“তুমি বদলে গেছ,” সিন্দাবাদ বলল।
রুহি পাল্টা বলল—
“তুমিও।”
“আমি অন্তত চেষ্টা করি।”
“আমি কি করি না?”
“তুমি আমাকে সময় দাও না।”
“তুমি আমাকে বোঝ না।”
স্বরে রাগ।
চোখে জল।
স্ক্রিনের মাঝখানে আগুন।
বিস্ফোরণ
রুহি হঠাৎ বলল—
“তুমি সবসময় সন্দেহ করো!”
সিন্দাবাদ চিৎকার করে উঠল—
“কারণ তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছ!”
“আমি নিজের জীবন গড়ছি!”
“আর আমি?”
“তুমি আমার জীবন না, সিন্দাবাদ!”
এই কথাটা যেন ছুরি।
দুজনই থমকে গেল।
রুহি বুঝল—সে বেশি বলে ফেলেছে।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
কান্নার মুহূর্ত
রুহির চোখ ভিজে গেল।
“আমি এমন বলতে চাইনি…”
সিন্দাবাদ মুখ ফিরিয়ে নিল।
“কিন্তু বলেছ,” সে বলল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর সিন্দাবাদ বলল—
“আমি সবসময় তোমাকে প্রাধান্য দিয়েছি।”
“আর আমি?” রুহি বলল, “আমি কি নিজের জন্য কিছু করতে পারি না?”
“পারো,” সিন্দাবাদ বলল, “কিন্তু আমাকে বাদ দিয়ে কেন?”
রুহি কাঁদতে লাগল।
জমে থাকা অভিযোগ
রুহি বলল—
“তুমি কখনও লন্ডনে আসোনি।”
“আমি চেষ্টা করেছি।”
“তুমি কখনও আমার পরীক্ষার দিন মনে রাখোনি।”
“আমি ভুলে যাইনি।”
“তুমি আমার ভয় বোঝোনি!”
সিন্দাবাদও চুপ থাকল না—
“তুমি আমাকে অপেক্ষায় রেখেছ।”
“তুমি আমার ফোন ধরোনি।”
“তুমি আমাকে একা ফেলে দিয়েছ!”
সব না-বলা কথা বেরিয়ে এলো।
ঝড়ের মতো।
ক্লান্ত পরিণতি
দুজনই নিস্তেজ।
রুহি ফিসফিস করে বলল—
“আমরা কি খুব ক্লান্ত হয়ে গেছি?”
সিন্দাবাদ বলল—
“হয়তো ভালোবাসতে গিয়েই ক্লান্ত হয়েছি।”
রুহি বলল—
“আমি আর লড়তে পারছি না…”
এই কথাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
বিচ্ছেদের ছায়া
রাত শেষে কল কেটে গেল।
কেউ “ভালো থেকো” বলল না।
কেউ “মিস ইউ” বলল না।
শুধু নীরবতা।
সেই নীরবতা ধীরে ধীরে বিচ্ছেদের রূপ নিচ্ছিল।
অধ্যায়ের শেষ
সেই রাতের পর তারা বুঝল—
ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়,
ভালোবাসা দায়িত্ব।
আর তারা দুজনই সেই দায়িত্বে ক্লান্ত।
না-বলা অভিযোগ অবশেষে বলা হয়ে গেছে।
কিন্তু তাতে সম্পর্ক বাঁচেনি।
আরও ভেঙে গেছে।
🌆 অধ্যায় বারো
স্মৃতির শহর
ঢাকায় ফেরা কখনও সহজ হয় না।
বিশেষ করে, যখন শহরটা ভরা থাকে কারও স্মৃতিতে।
সিন্দাবাদ বহু বছর পর ঢাকায় ফিরল।
মস্কোর বরফ, লন্ডনের কুয়াশা—সব পেছনে ফেলে আবার সেই চেনা গরম বাতাস, ধুলো, কোলাহল, আর মানুষের ভিড়।
বিমানবন্দরের দরজা দিয়ে বের হয়েই সে টের পেল—
ঢাকা তাকে চিনে ফেলেছে।
ফেরার দিন
ট্যাক্সিতে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল।
রিকশার রং।
ফুটপাথের দোকান।
চায়ের কাপে ধোঁয়া।
বাসের হর্ন।
সব আগের মতো।
তবু তার চোখে সব নতুন।
কারণ এবার সে একা।
ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল—
“ভাই, কোথায় যাবেন?”
সিন্দাবাদ একটু ভেবে বলল—
“ধানমন্ডি।”
রুহির বাসা ছিল ওখানে।
সে জানত না কেন বলল।
হয়তো অবচেতন মনই ঠিকানা বেছে নিয়েছে।
বন্ধ দরজা
ধানমন্ডির সেই রাস্তায় নেমে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
পুরোনো গেট।
নতুন রঙ।
নামপ্লেট বদলে গেছে।
রুহি আর এখানে থাকে না।
সে জানত।
তবু এসে দাঁড়িয়েছে।
নিজেকে বোঝাতে—
সব শেষ।
গুলশান লেকের ধারে
পরদিন বিকেলে সে গেল গুলশান লেকে।
ঠিক সেই বেঞ্চে বসলো, যেখানে তারা প্রথম সন্ধ্যা কাটিয়েছিল।
আজ পাশে কেউ নেই।
শুধু বাতাস।
আর স্মৃতি।
এক দম্পতি পাশ দিয়ে হাঁটছিল।
মেয়েটি ছেলেটার হাত ধরে আছে।
সিন্দাবাদ চোখ ফিরিয়ে নিল।
বলদা গার্ডেনের নীরবতা
বলদা গার্ডেনে ঢুকে সে অবাক হলো।
কিছুই বদলায়নি।
পাতা।
গাছ।
আলো।
শুধু তারা নেই।
একটা বেঞ্চে বসে সে চোখ বন্ধ করল।
রুহির কণ্ঠ কানে বাজল—
“ঢাকা এখানে থামে।”
সে ফিসফিস করল—
“তুমি না থাকলে, থামে না।”
বেইলি রোডের রাত
এক সন্ধ্যায় সে একা গেল বেইলি রোডে।
নাটক দেখল।
হলভর্তি মানুষ।
হাসি।
তালি।
সে একা বসে রইল।
নাটক শেষে সবাই বেরিয়ে গেল।
সে শেষ পর্যন্ত বসে থাকল।
কারণ একসময় রুহি বলেছিল—
“নাটক শেষ হলেও অনুভূতি থাকে।”
ফ্রেঞ্চ বেকারির টেবিল
গুলশানের ফ্রেঞ্চ বেকারিতে ঢুকল।
আগের সেই জানালার পাশের টেবিল।
কফি অর্ডার করল।
এক কাপ।
আগে দুই কাপ হতো।
ওয়েটার জিজ্ঞেস করল—
“স্যার, আর কিছু?”
সে বলল—
“না।”
এই ‘না’ তার জীবনের সারসংক্ষেপ।
তুরাগের ধারে শেষবার
এক রাতে সে তুরাগে গেল।
একাই।
নৌকা নিল না।
পাড়ে বসে রইল।
জোছনা উঠেছিল।
ঠিক আগের মতো।
সে বলল—
“দেখো রুহি… এখনো জোছনা ওঠে।”
কিন্তু কেউ শোনে না।
পুরোনো ডায়েরি
ঢাকায় ফিরে সে তার পুরোনো ফাইল খুলল।
ভেতরে রুহির লেখা ডায়েরির ফটোকপি।
একটা লাইন—
“ঢাকায় প্রেম করলে শহর মানুষ হয়ে যায়।”
সে নিচে লিখল—
“আর হারালে শহর কবরস্থান হয়।”
নিজের সাথে সমঝোতা
এক সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে সে সূর্য দেখছিল।
ঢাকা জাগছে।
মানুষ কাজে যাচ্ছে।
জীবন চলছে।
সে ভাবল—
“আমি কি এখানেই আটকে থাকব?”
উত্তর এলো না।
কিন্তু ভিতরে একটা নরম সিদ্ধান্ত তৈরি হলো—
থাকতে হবে।
বাঁচতে হবে।
অধ্যায়ের শেষ
সিন্দাবাদ বুঝল—
ঢাকা শুধু শহর নয়।
ঢাকা হলো আয়না।
এখানে দাঁড়ালে নিজের ভাঙা অংশগুলো দেখা যায়।
আর সেই ভাঙা অংশ নিয়েই সামনে হাঁটতে হয়।
একাই।
🌱 অধ্যায় চৌদ্দ
প্রেমের নতুন সংজ্ঞা
মানুষ সাধারণত প্রেমকে ভাবে—
কারও পাশে থাকা।
কারও জন্য অপেক্ষা করা।
কারও জন্য নিজেকে ভুলে যাওয়া।
সিন্দাবাদও তাই ভাবত।
রুহির আগে, রুহির সময়, রুহির পর—
সব প্রেমই তার কাছে মানে ছিল “ওকে হারাব না।”
কিন্তু একাকীত্বের শিখরে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে শুরু করল—
ভালোবাসা শুধু কাউকে আঁকড়ে ধরা নয়।
ভালোবাসা হলো নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।
সকালবেলার নতুন অভ্যাস
একদিন সে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠল।
আকাশ তখনও ধূসর।
রাস্তায় লোক কম।
সে জুতা পরল।
বাইরে বের হলো।
হাঁটতে শুরু করল।
ধানমন্ডি লেকের পাড় ধরে।
হালকা বাতাস।
পাখির ডাক।
শিশিরের গন্ধ।
অনেক দিন পর সে নিজের শ্বাসের শব্দ শুনল।
নিজের উপস্থিতি টের পেল।
আবার লেখায় ফেরা
সে আবার লিখতে শুরু করল।
শুরুর দিকে কষ্ট হতো।
কারণ প্রতিটি লাইনে রুহি ঢুকে পড়ত।
তবু সে থামেনি।
একদিন লিখল—
“আমি কাউকে হারাইনি।
আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছি।”
এই লাইনটা পড়ে সে নিজেই অবাক হলো।
নিজের জন্য সময়
আগে সে সময় দিত—
রুহিকে।
কাজকে।
সবার প্রয়োজনকে।
নিজেকে না।
এখন সে শিখল—
একলা সিনেমা দেখা।
একলা কফি খাওয়া।
একলা হাঁটা।
প্রথমে অদ্ভুত লাগত।
তারপর স্বস্তি।
ফয়সালের কথাগুলো
একদিন ফয়সাল বলল—
“তুই আগের চেয়ে ভালো দেখাচ্ছিস।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ। এখন তুই নিজের মতো।”
এই “নিজের মতো” কথাটা তার বুকের ভেতর ঢুকে গেল।
রুহির স্মৃতি বদলানো
একসময় রুহির কথা ভাবলেই কষ্ট হতো।
এখন ভাবলে—
একটা নরম ব্যথা।
যেমন পুরোনো দাগ।
থাকে।
কিন্তু রক্ত ঝরে না।
সে বুঝল—
সব প্রেম সারাজীবনের না।
কিছু প্রেম মানুষ বানানোর জন্য আসে।
নতুন পরিচয়
একদিন এক সাহিত্য আড্ডায় তার পরিচয় হলো নীলা নামের এক মেয়ের সাথে।
নীলা কথা কম বলে।
চোখে গভীরতা।
হাসি শান্ত।
সে সিন্দাবাদের লেখা পড়েছে।
বলল—
“আপনি খুব সত্যি লেখেন।”
সিন্দাবাদ লজ্জা পেল।
“আমি শুধু ভাঙা অংশগুলো লিখি,” সে বলল।
নীলা বলল—
“ভাঙা জিনিসেই আলো ঢোকে।”
এই কথাটা সে ভুলতে পারেনি।
বন্ধুত্বের শুরু
তারা মাঝে মাঝে কফি খেত।
বই নিয়ে কথা বলত।
রাজনীতি।
শহর।
মানুষ।
কোনো চাপ নেই।
কোনো দাবি নেই।
সিন্দাবাদ প্রথমবার বুঝল—
সব সম্পর্ককে প্রেম বানাতে হয় না।
কিছু সম্পর্ক শুধু আশ্রয়।
নিজের প্রতি ভালোবাসা
এক রাতে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
“আমি তোমাকে মাফ করেছি।”
“কাকে?”
“নিজেকে।”
যে ভুল করেছে।
যে বেশি ভালোবেসেছে।
যে নিজেকে হারিয়েছে।
সবকিছুকে।
নতুন সংজ্ঞা
ডায়েরিতে সে লিখল—
“প্রেম মানে—
কাউকে ধরে রাখা নয়,
কাউকে মুক্ত রাখা।
নিজেকে হারানো নয়,
নিজেকে খুঁজে পাওয়া।
ভয় নয়,
ভরসা।
অভাব নয়,
পূর্ণতা।”
অধ্যায়ের শেষ
সিন্দাবাদ জানত—
রুহি তার জীবনের বড় অধ্যায়।
কিন্তু শেষ অধ্যায় নয়।
শেষ অধ্যায় এখনো লেখা বাকি।
আর এবার সে কলমটা নিজের হাতে ধরেছে।
চলবে …..
