পাহাড়, ট্রেন আর বাবার হাত ধরা দিনগুলো

পাহাড়, ট্রেন আর বাবার হাত ধরা দিনগুলো

(শৈশবের একটি ভ্রমণকাহিনী)

আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মল, সবচেয়ে নির্ভার সময়টা ফিরে যায় ১৯৬৯ সালের সেই দিনগুলোতে—যখন আমার বয়স মাত্র নয়। তখন পৃথিবীটা ছিল ছোট, কিন্তু বিস্ময়ে ভরা; ভয় ছিল না, ক্লান্তি ছিল না, ভবিষ্যতের কোনো হিসাবও ছিল না। ছিল শুধু বাবার হাত, পাহাড়ের সবুজ, ট্রেনের শব্দ আর এক অনাবিল শৈশব।

সে সময় আমি বাবার সঙ্গে ছিলাম সিলেটের বড়লেখা থানার লাতু শাহবাজপুর ইপিআর ক্যাম্পে। জায়গাটা আজও চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে—একটা সুনিবিড় ছোট পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা আমাদের বাসস্থান, আর তার চারপাশে প্রকৃতির নিরবচ্ছিন্ন প্রহরা।

আমাদের বাড়িটা ছিল একটি ডাকবাংলো। সাধারণ কোনো কোয়ার্টার নয়—বরং একটি ছায়াঘেরা, নিরিবিলি কুঠির। কয়েকটি বেডরুম, লম্বা বারান্দা, কাঠের দরজা-জানালা, আর চারদিকে গাছপালার নিবিড় ছায়া। দুপুরবেলা রোদ ঢুকতে পারত না ঠিকমতো; গাছের পাতা ছেঁকে আলো এসে পড়ত মেঝেতে। রাত হলে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরের জঙ্গলের নীরবতা, আর পাহাড়ি বাতাসে কাঁপতে থাকা জানালার পাল্লা—সব মিলিয়ে সে এক অন্যরকম জীবন।

ডাকবাংলোর ঠিক নিচেই ছিল লাতু স্কুল। সেখানেই আমার পড়াশোনা। স্কুলে যাওয়ার পথটা ছিল পাহাড় বেয়ে নেমে যাওয়া—সবুজে গাঁথা এক পথ। পাহাড়গুলো ঢেউ খেলানো, যেন প্রকৃতি নিজেই ছাদের মতো ঢেকে রেখেছে চারপাশ। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কুয়াশা ভেদ করে হাঁটতাম, আর বিকেলে ফেরার সময় রোদের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে গায়ে গড়িয়ে পড়ত।

পাশেই ছিল শাহবাজপুর রেলস্টেশন। সেই স্টেশন আর ট্রেন ছিল আমার শৈশবের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ। আমরা ট্রেনে যেতাম—ঢাকা দক্ষিণ ভাগ, বড়লেখা, ছোটলেখা, জুড়ি হয়ে সরিষপুর। সব ট্রেন এসে মিলত কুলাউরা স্টেশনে। কুলাউরা ছিল যেন এক কেন্দ্র—যেখানে পাহাড়, মানুষ আর যাত্রার গল্প এসে এক হয়ে যেত।

কুলাউরা স্টেশনের রিফ্রেশমেন্ট রুম আমার কাছে কোনো সাধারণ খাবার জায়গা ছিল না—ওটা ছিল এক রাজকীয় বিশ্রামঘর। প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগারে ঢুকলেই চোখে পড়ত লম্বা, বিশাল বেত ও কাঠের ইজি চেয়ার। আমি আধা শুয়ে, আধা বসে সেখানে বিশ্রাম নিতাম পরবর্তী ট্রেনের অপেক্ষায়। বাইরে প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের বাঁশি, কুলি আর যাত্রীদের কোলাহল; ভেতরে শান্ত এক আলাদা জগৎ।

রিফ্রেশমেন্ট রুমের রেস্তোরাঁর খাবারের কথা আজও ভুলতে পারি না। গরম মাটন কারি, নরম পরাটা, আর শেষে ডিমের পুডিং। শৈশবে খাবারের স্বাদ শুধু জিভে নয়, স্মৃতিতেও লেগে থাকে। তখন বুঝিনি—এই স্বাদগুলো একদিন নস্টালজিয়া হয়ে ফিরে আসবে।

খাওয়া শেষে আবার ট্রেনে চড়ে সিলেট অভিমুখে যাত্রা। জানালার পাশে বসে তাকিয়ে থাকতাম—চা-বাগান, পাহাড়, নদী, গ্রাম—সব যেন এক চলমান ছবি।

লাতুর আশপাশে ছিল কয়েকটি চা-বাগান। তার মধ্যে কুমার শাইল চা-বাগান ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয়। প্রতি দুই দিন পরপর সেখানে হাতিতে চড়তাম। সেই হাতিটা ধীরে ধীরে আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। বিশাল শরীর, কিন্তু চোখে মায়া। আমি তার পিঠে বসে থাকতাম, সে ধীরে ধীরে চা-বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটত। চা-গাছগুলো পাহাড়ের গায়ে ঢেউ খেলত—মনে হতো, মসৃণ মখমল কাপড়ের চাদর গায়ে জড়িয়ে লাজুক কোনো ললনা পাহাড় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

একবার ছটলেখা চা-বাগানে শ্রমিক বিভ্রাট শুরু হলো। উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা—পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছিল। আমি বাবার সঙ্গে ইপিআরের জীপে চড়ে সেখানে গেলাম। বাবাকে আমি তখন শুধু বাবা হিসেবে নয়—একজন দায়িত্বশীল অফিসার হিসেবেও দেখলাম। তিনি শ্রমিকদের শান্ত করলেন, পরিস্থিতি সামাল দিলেন, মালিক ও ম্যানেজারদের নিরাপদে রাখলেন। সেদিন রাতে আমি ওখানেই রইলাম। সেই রাতটা আজও মনে আছে—অচেনা জায়গা, কিন্তু বাবার উপস্থিতিতে কোনো ভয় ছিল না।

লাতু ক্যাম্পের আশপাশে পাহাড় বেয়ে লাঠিটিলার পাহাড়ের চূড়ায় উঠতাম। উপরে উঠলে দূরে দূরে দেখা যেত পাহাড়ের সারি, জঙ্গলের গভীরতা। ক্যাম্পের বাবুর্চি আমার জন্য গরম মুরগির স্যুপ বানিয়ে দিত। শীতের রাতে সেই স্যুপের উষ্ণতা আজও যেন গলায় লেগে আছে।

শীতকালের সকালে বাবার সঙ্গে তাঁর কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে আমরা চলে যেতাম সারের পাড় বিওপি-র সামনে বিশাল হাওরে। সে এক বিস্ময়কর জায়গা। কুয়াশার ভেতর নৌকা আর স্পিড বোটে করে যেতাম—ইঞ্জিন বন্ধ করে, বৈঠা দিয়ে সন্তর্পণে। চারপাশে অসংখ্য পাখি। তখন পাখি শিকার ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। শিকার শেষে সারের পাড় ক্যাম্পে সেই পাখি দিয়ে লাঞ্চ—তারপর একটু বিশ্রাম।

এরপর আবার স্পিড বোটে করে যেতাম বারইগ্রাম বিওপি-তে। সেখানে রাত কাটাতাম। পরদিন জীপে করে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন বিওপি ভিজিট—ছুরখাই, বিয়ানিবাজার, সাদিপুর হয়ে শেষে সিলেট।

সিলেটের পানি—নীল, স্বচ্ছ, নিথর। খাসি পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি পানিতে পড়ে থাকত। কোনো কোলাহল নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই। দূরে খাসিয়া রমণীরা পিঠে বিরাট টুকরি বেঁধে পান, কমলা, সুপারি নিয়ে বাজারে যাচ্ছে। পাহাড়, মানুষ, প্রকৃতি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য।

আজ এত বছর পর বুঝি—ওটা শুধু একটি জায়গা ছিল না, ওটা ছিল একটি সময়। বাবার হাত ধরে পাহাড়ে ঘোরা, ট্রেনে চড়া, চা-বাগানে হাতির পিঠে বসা, হাওরে ভেসে যাওয়া—এসবই আমার জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

১৯৬৯ সালের লাতু শাহবাজপুর আজ হয়তো বদলে গেছে। আমিও বদলে গেছি। কিন্তু আমার ভেতরে সেই পাহাড়, সেই ট্রেন, সেই ডাকবাংলো—আজও অক্ষত। শৈশবের সেই ভ্রমণ কাহিনী আমার জীবনের সবচেয়ে নিঃশব্দ, সবচেয়ে শক্ত স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply