বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহ পরিণতি

বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ইতিহাস বিকৃতির ভয়াবহ পরিণতি

একটি জাতির ইতিহাস শুধু অতীত নয়—তা তার পরিচয়, নৈতিক ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার মূল স্তম্ভ। বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক আচরণ ক্রমেই সেই ইতিহাসকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যার রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে এই দেশটির জন্ম। পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর আকস্মিক ঘনিষ্ঠতা—বিশেষত সামরিক সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা কেনাকাটার প্রেক্ষাপটে—শুধু কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস নয়, বরং এটি একটি গভীর ও বিপজ্জনক ইতিহাস বিকৃতির ইঙ্গিত।

১৯৭১ সালের গণহত্যার দায় স্বীকার না করা, ক্ষমা না চাওয়া, এমন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের নামে হাত মেলানো বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রের মৌলিক প্রশ্ন তোলে।

১৯৭১: অমীমাংসিত ইতিহাসের ভার

পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চালানো গণহত্যার দায় স্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিক গবেষণা, সাংবাদিকতা, কূটনৈতিক নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী—লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা, অসংখ্য নারী ধর্ষণ, বুদ্ধিজীবী নিধন এবং পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক ধ্বংস ছিল পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের অংশ।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এসব অপরাধ স্পষ্টভাবে গণহত্যার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্র আজও সেই ইতিহাস অস্বীকার করে, কখনো “গৃহযুদ্ধ”, কখনো “উভয় পক্ষের সহিংসতা” বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ যদি কোনো ন্যায়বিচার, ক্ষমা কিংবা সত্য উদ্ঘাটন ছাড়াই পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে, তবে তা ইতিহাসের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

সামরিক সহযোগিতা: কৌশল না সংকট?

রাষ্ট্রীয় অস্ত্র কেনা কেবল অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এটি রাজনৈতিক আস্থার প্রকাশ। পাকিস্তানের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান বা সামরিক সরঞ্জাম কেনা মানে সেই রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা, যে প্রতিষ্ঠান একসময় বাংলাদেশের জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল এবং আজও সেই অপরাধ অস্বীকার করে।

এ প্রশ্ন উঠতেই পারে—বাংলাদেশের নিরাপত্তা কি এমন কোনো স্তরে নেমে গেছে যে তাকে ইতিহাসের হত্যাকারীর কাছেই ফিরতে হচ্ছে?

আরও উদ্বেগজনক হলো, পাকিস্তানের সামরিক মতবাদ মূলত সংঘাতনির্ভর। দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা, প্রক্সি যুদ্ধ এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করা তাদের দীর্ঘদিনের কৌশল। এমন রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বনাম রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—যে দেশটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—তা অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানঘেঁষা অবস্থান নেওয়া বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি শত্রুতামূলক ভাষ্য গ্রহণ করা কেবল কূটনৈতিক অপরিণামদর্শিতা নয়, বরং আত্মঘাতী রাজনৈতিক কৌশল।

ইতিহাস বলে, যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা বাস্তবতার বদলে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থে নির্ধারণ করে, তারা শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা হারায়।

নির্বাচনী প্রকৌশল এবং অতীতের পুনর্বাসন

এই আন্তর্জাতিক নীতির পরিবর্তনকে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বাংলাদেশ ক্রমেই একটি নিয়ন্ত্রিত, পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে—যেখানে জনগণের অংশগ্রহণ নয়, বরং ক্ষমতা নিশ্চিত করাই মুখ্য লক্ষ্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই রাজনৈতিক প্রকল্পে একটি পরিচিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর পুনর্বাসন, যাদের আদর্শিক শিকড় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানপন্থী সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত। এই গোষ্ঠীগুলো একসময় স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং ধর্মের নামে গণহত্যাকে বৈধতা দিয়েছিল।

আজ তাদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া মানে ইতিহাসকে নতুন করে লেখা।

রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সংকট

বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়—এটি একটি নৈতিক ঘোষণা। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্র ছিল তার জন্মলগ্নের অঙ্গীকার।

যখন রাষ্ট্র নিজেই সেই ইতিহাসকে আপসের টেবিলে তোলে, তখন রাষ্ট্রীয় বৈধতা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও ইতিহাস আমাদের শেখায়—যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জন্মকথা অস্বীকার করে, তারা টিকে থাকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে, সম্মতির মাধ্যমে নয়।

এ ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

উপসংহার: সতর্কবার্তা, ভবিষ্যদ্বাণী নয়

বাংলাদেশ এখনো ফিরে দাঁড়াতে পারে। ইতিহাস সংশোধনের নয়, ইতিহাসের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাতে পারে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক হতে পারে—কিন্তু তা অবশ্যই সত্য, দায়স্বীকার এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি পরীক্ষার মুহূর্ত। গণহত্যার স্মৃতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা কি কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি, নাকি বাস্তব নীতির ভিত্তি?

বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই—সে কি ১৯৭১-এর আদর্শে দাঁড়িয়ে থাকবে, নাকি ইতিহাসকে দরকষাকষির পণ্যে পরিণত করবে?

ইতিহাস অপেক্ষা করে না। সে একদিন ফিরে আসে—আর তখন ক্ষমতা নয়, সত্যই শেষ কথা বলে।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply