গণতন্ত্রের ছায়ামাত্র: নির্বাচনের আড়ালে ক্ষমতার কঠিন বাস্তবতা
বাংলাদেশ আজ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে গণতন্ত্র নামটি বহাল থাকলেও তার প্রাণশক্তি ক্রমেই নিঃশেষিত হচ্ছে। নির্বাচন হচ্ছে, সংবিধান রয়েছে, প্রতিষ্ঠান কাজ করছে—এই বাহ্যিক দৃশ্যপটের আড়ালে গড়ে উঠছে এক ভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামো, যেখানে ক্ষমতা আর জনগণের সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং ভয়, নিয়ন্ত্রণ ও আপসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন—একটি প্রতিষ্ঠান, যার ওপর জনগণের আস্থা একসময় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি ছিল। আজ সেই আস্থা গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অসম্পূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ ভোটার তালিকা, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নাম বাদ পড়া, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব—এসব আর বিচ্ছিন্ন ত্রুটি নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। বিশেষ করে যখন সংখ্যালঘু নাগরিকরা ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির কারণে ভোটকেন্দ্রের পথেই হাঁটতে পারেন না, তখন নির্বাচন কাগজে-কলমে যতই সুষ্ঠু হোক না কেন, বাস্তবে তা গণতান্ত্রিক থাকে না।
এই নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিবেশও কম উদ্বেগজনক নয়। দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের নির্বাচন বর্জন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়—এটি পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন তোলে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায়। বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার, নির্বিচার আটক, দলীয় কার্যক্রমে বাধা—এসব মিলিয়ে এমন এক ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে রাজনীতি করা নিজেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা তখন আর অধিকার নয়, বরং অনুমতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এই দমননীতি রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে গিয়েও সমাজের গভীরে প্রভাব ফেলছে। নাগরিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, মুক্ত মতপ্রকাশ—এসব মৌলিক স্বাধীনতা ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা, প্রতিবাদে কঠোরতা, ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা সমাজকে নীরব করে তুলছে। রাষ্ট্র এখানে শৃঙ্খলার নামে দৃশ্যমানতা ও প্রতিবাদকে অগ্রিম দমন করতে চাইছে।
গণমাধ্যমের অবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়। সাংবাদিকতা এখন সত্য প্রকাশের চেয়ে টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হয়েছে। মামলা, হুমকি, বিজ্ঞাপন ও অর্থনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম এক প্রকার আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মানেই ঝুঁকি। যখন সংবাদমাধ্যম সত্যের বদলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন জনগণ তথ্য নয়, বরং বাছাই করা বয়ানই পায়।
নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো—যারা রাষ্ট্রের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ভূমিকা পালন করত—তারা আজ নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ ও অপমানের শিকার। লাইসেন্স, অর্থায়ন, প্রশাসনিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে বহু সংগঠন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে রাষ্ট্র নিজের নাগরিক সমাজকে সহ্য করতে পারে না, সে রাষ্ট্র আর গণতান্ত্রিক থাকে না—সে কেবল নির্বাচনী বৈধতা ব্যবহার করে কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখে।
এই সামগ্রিক সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা। উপাসনালয়ে হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জীবিকায় আঘাত—এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রায়শই দুর্বল ও বিলম্বিত। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়, আর ভুক্তভোগীরা নীরব থাকতে বাধ্য হয়। এতে স্পষ্ট হয়—এই রাষ্ট্রে সবার নাগরিকত্ব সমান নয়।
এ প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক পরিসরে জামায়াতে ইসলামীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান, যুদ্ধাপরাধের ইতিহাস ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি বিরোধিতার পরও এই রাজনৈতিক শক্তির নীরব গ্রহণযোগ্যতা রাষ্ট্রের আদর্শগত ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা প্রশ্ন তোলে—এটি কি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, নাকি সচেতন ঝুঁকি গ্রহণ?
আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে জামায়াতের আর্থিক নেটওয়ার্ক ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ নিয়ে। দাতব্য সংস্থা ও ব্যবসার আড়ালে পরিচালিত এসব অর্থপ্রবাহ কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা এখানে কাকতালীয় মনে হয় না।
পাকিস্তান-সংযোগ ও বিদেশি প্রভাবের অভিযোগও এই বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আদর্শিক উগ্রতা ও প্রভাব বিস্তারের খেলায় বাংলাদেশকে টানার চেষ্টা নিছক অনুমান নয়। যখন অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বাহ্যিক স্বার্থ একত্র হয়, তখন সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এই সবকিছুর সমষ্টিগত ফল হলো সামাজিক বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষয়। যে দেশ ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদের অঙ্গীকার নিয়ে জন্ম নিয়েছিল, সে দেশ আজ পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অস্থিরতা ও অসন্তোষকে পুঁজি করে চরমপন্থী শক্তিগুলো নিজেদের রাজনৈতিক জায়গা শক্ত করছে।
শেষ পর্যন্ত যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা কোনো একক ব্যর্থতার নয়—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত স্খলন। এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নির্বাচন আছে কিন্তু আস্থা নেই; শাসন আছে কিন্তু সম্মতি নেই; নিরাপত্তা আছে কিন্তু সবার জন্য নয়। ইতিহাস বলে—গণতন্ত্র একদিনে ভাঙে না। এটি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়, নিয়মের ভেতর দিয়েই। একসময় দেখা যায়, কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে—কিন্তু তার ভেতরে আর কোনো প্রজাতন্ত্র নেই।
বাংলাদেশ সেই বিপজ্জনক সীমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।

